হযরত বদর শাহ (রহ.) এর বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানা যায়, হযরত ইমাম শেহাবুদ্দীন মক্কী (রহ.) তাঁর পিতামহ ছিলেন। তাদের আদি নিবাস আরবে। হযরত শেহাবুদ্দীন মক্কী (রহ.) এর ছেলে হযরত ফখরুদ্দীন (রহ.) কে তিনি এলেম প্রদান করে ভারতে আসার নির্দেশ দেন।
হযরত ফখরুদ্দীন (রহ.) ভারতের মিরাঠে এসে অবস্থান করেন। তখন মিরাঠ ছিল বনে জঙ্গঁলে পরিপূর্ণ। তিনি সেখানে অবস্থান করে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়ে যান। মিরাঠে তাঁর আগমনের পর পুরো এলাকা আবাদ হয়ে যায় এবং বসতি স্থাপনা গড়ে উঠে। মিরাঠে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় পাওয়ার পর ক্রমে লোকজন তাঁর কাছে এসে শিষ্যত্ব গ্রহন করতে শুরু করেন। তাঁর নাম চারিদিকে প্রচারিত হতে থাকে। হযরত ফখরুদ্দীন (রহ.) এর ছেলে হযরত শেহাবুদ্দীন (রহ.) তখনকার মিরাঠের শাসন কর্তার হাতে শহীদ হন। হযরত শেহাবুদ্দীন (রহ.) এর পাঁচ সন্তান ছিল। এই পাঁচ সন্তানের মধ্যে বদর শাহ (রহ.) সর্ব কনিষ্ঠ ছিলেন।
ছোট বেলা থেকেই তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকেই জাহেরী বাতেনী শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তার শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে ধর্ম প্রচার করতে করতে চট্টগ্রামে এসে হাজির হন। হযরত বদর শাহ (রহ.) চট্টগ্রামে আগমনের তাঁর স্ত্রী,ছেলে হযরত শাহাবু্দ্দীন কেতাল (রহ.) , এক কন্যা হযরত আবদান বিবি (রহ.) সাথে এবং ভাগিনা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)আগমন করেন।
হযরত বদর আউলিয়া (রহ.)'র আগমন সম্পর্কে ইমাম গাজী শেরে বাংলা (রহ.)'র বাণীঃ হযরত বদর আউলিয়া (রহ.) চট্রগ্রামে আগমন সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিকগন ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তাদের মতে তিনি পাঁচ-ছয় শত কিংবা সাতশত বছর পূর্বে চট্রগ্রামে আগমন করেছিলেন।
এসব তথ্যের উৎস হলো হযরত বদর আউলিয়া (রহ.)'র মাজার শরীফের স্থাপত্যের সময়কাল। কারণ ধারনা করা হয় যে এটি প্রায় সাতশত বছর পূর্বে সুলতানী আমলের আদলে নির্মিত হয়েছে।
হযরত বদর শাহ (রহ.)'র আগমন সম্পর্কে ইমাম গাজী শেরে বাংলা (রহ.) তাঁর কাশফ জ্ঞান দ্বারা লিখিত দিওয়ানে আজিজে সঠিক তথ্য তুলে ধরেন। "ওই শাহ বদরকে শত স্বাগতম, শত মোবারকবাদ। তাঁকে নিঃসন্দেহে বার আউলিয়ার অন্যতম বলে জানবে। নিশ্চয় তাঁর দ্বারা চট্রগ্রাম আবাদ হয়েছে। তাঁকে স্বাগতম। ওলীগণের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহ পূর্ণিমা চাঁদের মত হয়ে এসেছেন।
দু’শ হিজরি সালের কাছাকাছি সময়ে চট্রগ্রাম আবাদ হয়েছে। এর তিনশ বছর পর গাউসুল আজম তাশরিফ এনেছেন। এতে কারো দ্বিমত নেই।
কথিত আছে, আরব দেশ থেকে বদর শাহ নামক একজন সুফি সাধক ভাসমান একখণ্ড পাথরের উপর আরোহণ করে পূর্ব দেশে রওনা হন। তারপর একদিন পাথরখণ্ডটি বদর শাহকে নিয়ে কর্ণফুলি নদীতে প্রবেশ করে এবং নদীর যে স্থানে পাথরটি থেমে যায় সেইস্থানে তিনি নেমে যান।পরবর্তীকালে বদর শাহকে বহনকারী পাথরের স্মারকরূপে সে স্থানটি ‘পাথরঘাটা’ নামে খ্যাত হয়।
তখন সমগ্র চট্টগ্রাম শহর ছিল জনমানবহীন গভীর অরণ্যে আবৃত। সেখানে ছিল জ্বীন-পরীর আবাসস্থল। বদর শাহ একটি মাটির চেরাগ হাতে নিয়ে পাথরখণ্ড থেকে নেমে তীরে উঠে গভীর বন-জঙ্গলের মধ্যে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একটি পাহাড়ের উপর উঠলে জ্বীন-পরী তাঁকে বাধা দান করে।
হযরত বদর শাহ (রহ.)জ্বীনদের কাছ থেকে একটা ছোট চাটি( মাটির প্রদীপ) রাখার সম পরিমান জায়গা চেয়ে নেন। চাটি জ্বালাবার পর সেটির আলো চারিদিকে ছড়ি্যে পড়ে এবং জ্বীনেরা সে জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়। এভাবে তিনি জ্বীন-জন্তুর কবল থেকে এই স্থানটিকে মুক্ত করে আবাদযোগ্য করে তোলেন।
তিনি সর্ব প্রথম যে স্থানটিতে চাটি জ্বালিয়ে ছিলেন সে স্থানটি আজো বর্তমান আছে। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খাঁন এলাকায় এই স্থানটি অবস্থিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এই স্থানটিকে মর্যাদার সাথে সংরক্ষণ করেছেন। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন। চাটি জ্বালিয়ে চট্টগ্রাম শহরকে আবাদ করায় চট্টগ্রামের আদি নাম ছিল চাটিগাঁ।
ডঃ গোলাম সাকলায়েন তার ‘বাংলাদেশের সুফী সাধক’ গ্রন্থে লেখেন, “পূর্বে চট্টগ্রামের পাহাড় প্রভৃতি অঞ্চলে জ্বীন-ভূত-প্রেতের বসতি ছিল। চট্টগ্রামের অধিবাসীগণ এখনও কোন কোন পাহাড়ের উল্লেখ করতে গিয়ে তাকে ‘পরীর পাহাড়’ নামে অভিহিত করেন। হযরত বদর শাহ (রহ.)ভক্তগণ তাঁকে চট্টগ্রাম শহরের ‘অভিভাবক দরবেশ’ বলে থাকেন’’। অতঃপর ক্রমন্বয়ে ওই শাহ বদরের তাওয়াজ্জুহাদির কারণে ওই শহর থেকে তারা সফর করে চলে গেছে। কিছুদিন পর ওই স্থান মানুষের বাস স্থানে পরিণত হয়েছে। তারপর এ শহরের নাম হলো চাটগাম বা চট্রগ্রাম।"
চট্টগ্রাম মুসলমানদের রাজ্যভূক্ত হওয়ার আগে অর্থাৎ ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ চট্টগ্রাম জয় করার আগেই ইসলাম প্রচারের জন্য সুদূর আরব থেকে হযরত বদর শাহ এখানে আসেন।
ইমাম শেরে বাংলা (রহ.)'র দিওয়ানে আজিজের মাধ্যমে জানা যায়, তিনি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)'র আগমনের তিনশত বছর পূর্বে অর্থাৎ প্রায় ১২শত বছর আগে চট্রগ্রামে তাশরিফ আনেন। সে হিসেবে তিনি তাবেয়ীদের যুগের একজন বড় মাপের আউলিয়া ছিলেন । আর ওনার ভাগ্নে হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহ.) একই সাথে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড় আনোয়ারায় তাশরিফ নিয়ে সেখানেও জিন প্রেত তাড়িয়ে মানুষের আবাস ভূমিতে রূপান্তর করেন।
কথিত আছে যে, হযরত বদর শাহ (রহ.)চট্টগ্রামে এসে প্রথমে সমুদ্র তীরে আস্তানা গড়ে তুলতে চাইলে স্থানীয় জনসাধারণ তাঁকে এখানে আস্তানা গড়ে তুলতে নিষেধ করেন। কারণ এখানে সমুদ্রের জোয়ার এসে পুরো এলাকা প্লাবিত করে ফেলে । কিন্তু তিনি স্থানীয় জনসাধারণের কথায় কর্নপাত না করে সেখানেই আস্তানা গড়ে তোলেন এবং আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হলেন। এমনি সময় সমুদ্রে ঝড় তুফান শুরু হল।
সমুদ্র গর্জন করে পানি দ্রুত বেগে তাঁর আস্তানার দিকে আসতে লাগল এই অবস্থা দেখে স্থানীয় জনসাধারণ উৎণ্ঠার মধ্যে পড়ে যায়। কিন্তু হযরত বদর শাত (রহ.) অবিচলভাবে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং জোয়ারের পানিকে আঙ্গুঁলের দ্বারা ইশারা করলেন অন্যদিকে চলে যাওয়ার জন্য। আল্লাহর মেহেরবানীতে জোয়ারের পানি অন্যত্র সরে গেল। তারপর থেকে সমুদ্রের জোয়ারের পানি প্রবল বেগে এদিকে আর আসেনি। পরবর্তীতে এখানেই মূল চট্টগ্রাম শহর গড়ে উঠে।
প্রবাদে আছে সমুদ্রে ঝড় তুফান উঠলে এবং সমুদ্রে জাহাজ বা নৌকা ছাড়ার পূর্বে জাহাজ বা নৌকায় চালকরা বদর শাহ (রহ.) এর উসিলায় আল্লাহর সাহায্য কামনা করে থাকেন।
পাথরে ভেসে তাঁদের সমূদ্র যাত্রার মধ্যেও অনেক কেরামতের কথা উল্ল্যেখ পাওয়া যায়।এর মধ্যে অন্যতম হলো বদর ছুরি; যাত্রা পথে ভাগ্নে মোহছেন আউলিয়ার প্রতি রাগান্বিত হয়ে বদর শাহর ছুরিটি নিক্ষেপ করলে সেটি পানিতে পরে মাছে হয়ে যায়। চট্রগ্রামের মানুষরা এই ধরণের মাছ গুলোকে বদর ছুরি বলে ডাকে।
১৩৯৭ সালে তিনি ওফাত লাভ করেন। চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিলায় বখশীর হাটের নিকটবর্তী বদরপট্টি বা বদরপাতি নামে স্থানে তাঁর মাযার অবস্থিত।

0 Comments