Header Ads Widget

হযরত বায়োজীদ বোস্তামী (রহ.)

 

হজরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) ৮০৪ সালে বর্তমান ইরানের রাজধানী তেহরানের পার্শ্ববর্তী কুমিস প্রদেশের অন্তর্গত খোরাসানের এক প্রসিদ্ধ শহর বোস্তাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম আবু ইয়াজিদ তাইফুর ঈসা বিন আদম বিন সরুশান। পিতা-মাতা তার নাম রাখেন আবু ইয়াজদ। তিনি বোস্তাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন তাই তার নামের শেষে বোস্তামী শব্দ ব্যবহার করা হয়।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর সম্মানিত পিতা হযরত ঈসা বোস্তামী (রহ.) তবে তাবেয়ীন ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ, আল্লাহ ওয়ালা, দ্বীনদার ও খোদাভীরু মুসলমান ছিলেন। কথা বার্তা, চলা-ফেরা এবং জীবনের প্রতিটি কার্যাদিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। তাকওয়া ছিল তাঁর জীবনের প্রধান পাথেয়। বিশেষ করে খানা-পিনা, পোশাকাদি এবং রুজি-রুজগার ইত্যাদিতে এত বেশী সাবধানতা অবলম্বন করতেন যে, সন্দেহযুক্ত বস্তু থেকেও তিনি বিরত থাকতেন এবং তাঁর  মাতা  সতী-সাধবী, লজ্জাবতী এবং অতি পর্দাশীল চরিত্রবান মহিলা ছিলেন। বিনয়ী, ধৈর্য্যশীলতা, উচ্চ বংশীয় মর্যাদা, ধর্মীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণতাসহ যাবতীয় উত্তম গুণাবলী তাঁর জীবনে পরিলক্ষিত হয়। ইবাদত-রিয়াযত এবং তাকওয়া পরহেজগারীতে যুগের অদ্বিতীয়া ছিলেন। ধর্ম পরায়ণা মহিলা হিসাবে বোস্তামে তাঁর খ্যাতি ছিল।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) স্বীয় মাতা সম্পর্কে বলেন- আমার বুযুর্গ মা মুসতাজাবাভূত দাওয়াত' (যার দোয়া আল্লাহর নিকট সঙ্গে সঙ্গে কবুল) ছিলেন। সব সময় আল্লাহর কাছে এই বলে ফরিয়াদ করতেন- “হে আল্লাহ! আমাকে তোমার সন্তুষ্টি এবং তোমার রাসূল (স.)এর আনুগত্যের তৌফিক দান কর। যাবতীয় হারাম থেকে বেঁচে হালালভাবে জীবন-যাপন করার সুযোগ দাও”।  আল্লাহ্ তায়ালা দোয়া কবুল করে তাঁকে এমন বুযুর্গী দান করলেন যে, যখন খাওয়ার জন্য তাঁর সামনে খাবার দেয়া হত তখন খাবার হালাল হলে তাঁর হাত সেদিকে প্রসারিত হত আর খাবার হারাম এমনকি সন্দেহ যুক্ত হলেও তাঁর হাত সেদিকে প্রসারিত হত না।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার নিকট পবিত্র কোরআন মজীদের পাঠ দিয়ে । কিছুদিন পর পিতা শিশু বায়েজীদকে বোস্তামের এক মক্তবে ভর্তি করে দেন। তবে পুত্রের জীবনের কোন সফলতা তিনি দেখে যেতে পারলেন না। বায়েজীদের বাল্যকালেই পিতা ইন্তেকাল করেন। পিতৃহারা শিশুর লেখা-পড়ার যাবতীয় দায়িত্ব মাতার উপর ন্যস্ত হয়। পিতার ন্যায় মাতাও যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং জ্ঞানী ছিলেন বিধায় বায়েজীদের শিক্ষা-দীক্ষা নির্বিঘ্নে চলতে লাগল।


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) যেমনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী, তেমনি পড়া-লেখায় বিশেষ মনোযোগী। ফলে শিক্ষা জীবনের প্রথম পর্যায়েই শিক্ষকগণের শুভদৃষ্টি তাঁর উপর পড়ে। তাঁর চলা-ফেরা, কথা-বার্তা, আদব-ভক্তি এবং নিয়মিত যাতায়াত ও পড়া-শুনা শিক্ষকগণকে মুগ্ধ করে।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর শিক্ষা গ্রহণের ধারা ছিল স্বতন্ত্র এবং বিস্ময়কর। শিক্ষকগণ হতে যা শিক্ষা লাভ করতেন, শুধু বাহ্যিকভাবে তা আয়ত্ব করে বিরত হতেন না, বরং তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যও অনুসন্ধান করতেন। তাঁর এই অবস্থা দেখে শিক্ষকগণ সকলেই একমত পোষণ করতেন যে, তাঁদের এই ছাত্রটির মধ্যে বিরাট সম্ভাবনার বীজ লুকায়িত আছে। নিঃসন্দেহে তা আত্মপ্রকাশ করবে। শিক্ষকগণের মনের এই ধারণা সত্যিকারভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল।


একদিনের ঘটনা, শিক্ষক তাঁকে কুরআনুল করিমের নিম্নোক্ত আয়াতে করিমা পড়ে শোনান-  আল্লাহ তা'আলা বলেন- "আমার এবং তোমার মাতা পিতার আনুগত্য করো। (সূরা লোকমান; আয়াত ১৪)"। তখন তিনি চিন্তা করতে লাগলেন এক সাথে আল্লাহ্ তায়ালা এবং মাতা-পিতার আনুগত্য পরিপূর্ণভাবে করা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহর আনুগত্য যথাযথভাবে করতে গেলে মাতা-পিতার করা যাবে না। মাতা-পিতার আনুগত্য যথাযথ করতে গেলে আল্লাহ্ তায়ালার করা যাবে না। এই চিন্তায় লেখা-পড়ায় আর মন বসছে না। শিক্ষক মহোদয়ের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে ছুটে আসলেন। পুত্রকে দেখে মা জিজ্ঞাসা করলেন, কী তাইফুর! তুমি অসময়ে চলে এসেছো কেন?


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) তাঁর মাকে পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা পূর্বক বললেন- আম্মাজান! হয়ত আল্লাহ্ ত্বায়ালার কাছে প্রার্থনা করে আমাকে শুধু আপনার জন্য নিয়ে নেন, আমি সারা জীবন বিরামহীনভাবে আপনার খেদমত করে যাবো। নতুবা আপনার দাবী প্রত্যাহার করে নিয়ে আমাকে আল্লাহর এবাদতের জন্য ছেড়ে দিন। আমি মনে প্রাণে তাঁর বন্দেগী করে যাবো।


অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলের মুখে এত সুন্দর কথা শুনে মা জননী খুশীতে আত্মহারা হয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন এমনযোগ্য সন্তান দান করার জন্য। দু' চোখ হতে দুই ফোঁটা আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তিনি পুত্রের পিঠে হাত রেখে বললেন, আমার জীবন আল্লাহ তা'আলা ধন্য করেছেন। আমার আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নাই। আমি পরম খুশীতে তোমাকে আল্লাহর জিম্মায় সোপর্দ করলাম। তুমি স্বীয় দেহ-মন আল্লাহর খেদমতে নিয়োজিত করে তাঁর সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ো।

অতি অল্প সময়ে শরীয়ত তথা কুরআন, হাদীস এবং ফিক্হ ইত্যাদির জাহেরী ইলম অর্জন করার পর বাতেনী ইলম তথা তরীকতের দীক্ষা লাভের আশায় হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.)  মায়ের অনুমতি এবং দোয়া নিয়ে শাম সহ বিভিন্ন দেশের দিকে যাত্রা করলেন।


দীর্ঘ তিন বছরে প্রায় একশত সত্তর জন যুগ বিখ্যাত মুহাদ্দেসীন, ফোকাহা এবং উলামা-মাশায়েখের সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁদের খেদমতে মননিবেশ করেন এবং তাদের থেকে পবিত্র কুরআন-হাদীসসহ শরীয়তের বিভিন্ন শাখা-উপশাখায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষতঃ শরীয়তের জ্ঞানের পাশাপাশি মারেফাতের জ্ঞান এবং সূফীতত্ত্বের অনেক নিগুঢ় রহস্য সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন। এই তিন বছর জ্ঞানার্জনে এমন সাধনা করেছিলেন যে, পানাহার, আরাম-আয়েশ এবং নিদ্রা পরিত্যাগ করতঃ বিরামহীনভাবে এক দেশ হতে অন্য দেশে, এক জ্ঞানীর জ্ঞান আহরণ করে অন্য জ্ঞানীর সন্ধানে ছুটে ছিলেন। আল্লাহর প্রেমের শরাব এবং জ্ঞানার্জনের প্রবল আগ্রহই ছিল তাঁর একমাত্র পাথেয়।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) যদিও অসংখ্য বেলায়তের মহান ছেরতাজগণের খেলাফত এবং ফায়েজ লাভে ধন্য হয়েছিলেন। তবে তাঁর প্রধান পীর মুর্শিদ হিসাবে যার নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য তিনি হলেন ইমামুস্ সাদেকীন, ডাজুল আরেফীন, শাইখুল মাশায়েখ আওলাদে রাসূল (স.) হযরত সৈয়্যদ ইমাম জাফর সাদেক (রহ.)।


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) খুবই অল্প বয়সে (বিশ বছরের কম) হযরত সৈয়দ ইমাম জাফর সাদেক (রহ.)-এর দরবারে এসে তাঁর হাত মুবারকে বায়াত গ্রহণ করলেন।

তাঁর মোর্শেদের দরবারে থেকে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) ইলমে শরীয়তের উচ্চ শিক্ষা এবং ইলমে মারেফাতের বহু মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করতে লাগলেন। এভাবে বেশ কয়েক বছর অতিবাহিত হয়।

এত কম বয়সের এই নব যুবক বায়েজীদের জ্ঞান-গরীমা, চরিত্র আদর্শ এবং আদব-ভক্তি ইত্যাদি দেখে হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রা.) পূর্ব থেকেই তাঁর উপর মুগ্ধ হন।


একদিন ইমাম জাফর সাদেক (রহ.) বললেন, বায়েজীদ অমুক কিতাবখানা আমাকে দাও। 

বায়েজীদ বললেন, হুজুর! উক্ত কিতাবটি কোন তাকে? 

বায়েজীদের প্রশ্নে হুজুর চমকিত হয়ে বললেন, আশ্চর্য! তুমি এত বছর এখানে অবস্থান করার পরও কিতাবটি কোন তাকে জানো না? বায়েজীদ বললেন হুজুর। এখানে কয়েক বছর ধরে অবস্থান করলেও আমি মনযোগ দিয়ে শুধু আপনার পবিত্র বাণী শ্রবণ এবং আপনার নূরানী চেহারার দিদারই লাভ করেছি। অন্য কোন দিকে দৃষ্টি দেয়ার সুযোগ পর্যন্ত আমার হয়নি। বায়েজীদের মুখে এই সুন্দর উক্তি শুনে হযরত জাফর সাদেক (রহ.) অত্যন্ত এটা শুনে আশ্চর্য এবং আনন্দিত হয়ে বায়েজীদের দিকে এক মহব্বতের দৃষ্টি দান করলেন এবং তাঁরই যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে খেলাফত প্রদান করে মাথায় পাগড়ী এবং ফেরকা (খেলাফতের এক বিশেষ পোষাক) পরিধান করিয়ে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে জাহেরী ইলমের সাথে সাথে ইলমে লাদুন্নী তথা অদৃশ্য ইলম, যা ইমাম জাফর সাদেক (রহ.) বেলায়তের সিলসিলা মারফত নবী করিম (স.) থেকে লাভ করেছিলেন তা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) লাভ করে ধন্য হলেন। এরপর বায়েজীদকে বললেন, তোমার সাধনা পূর্ণ হয়েছে। এবার তুমি আল্লাহর বান্দাদের সেবায় ছড়িয়ে পড়ো।


ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা মতে প্রথম তিন বছরে তিনি একশত সত্তর জন তরীকতের যুগশ্রেষ্ঠ অলীদের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। তবে এদের মধ্যে যে কয়েকজন বুযুর্গ মহামানবদের নাম গ্রহণযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে হলেন-

১. ইমামুস্ সাদেকীন হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রা.) (১৪৮হি.)

২. মুহাদ্দেসে আজম হযরত আবু আব্দুর রহমান আছ-ছন্দী (রহ.)

৩. মুহাদ্দেসে আজম হযরত মুহাম্মদ বিন মানসুর আত তাওসী (রহ.)

৪. শাইখুল মাশায়েখ হযরত ইসমাঈল দুর্কী (রহ.)

৫. শাইখুল মাশায়েখ হযরত ইমান আলী রেখা ইবনে সৈয়্যদ ইমান মূসা কাজেম (রহ.)

 ৬. শাইখুল মাশায়েখ হযরত মুহাম্মদ বিন ফারেছ (রহ.)

 ৭. ইমামু তাসাউফ হযরত আবু আলী সিন্ধি (রহ.)


মায়ের সেবায় ও হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) এর নামই বিশ্বব্যাপী পরিচিত।


এক রাতে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর মাতা নিজ শয্যায় শায়িত হয়েছেন। হঠাৎ তাঁর অত্যন্ত পানির পিপাসা লাগল। তখন তিনি পুত্রকে ডেকে বললেন, বায়েজীদ! আমার পানির পিপাসা লাগল। তুমি আমার জন্য এক গ্লাস পানি আন। বায়েজীদ বোস্তামী সঙ্গে সঙ্গে পানি আনতে গেলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তখন পানির কলসী ছিল ধন্য। ঘন অন্ধকার নিরব নিস্তব্ধ রাতে কিশোর বালক কলসী নিয়ে অনেক দূরে নদী হতে পানি আনতে গেলেন। কোন রকমের ভয়-ভীতি তাঁর অন্তরকে নাড়া দিতে পারে নাই। দূর থেকে পানি নিয়ে প্রত্যাবর্তন করতে একটু বিলম্ব হল। বায়েজীদ এক গ্লাস পানি নিয়ে মায়ের পাশে এসে দেখলেন, তিনি জাগ্রত নাই। গভীর নিদ্রায় অচেতন হয়ে আছেন।


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) মাকে জাগ্রত করে পানি পান করাবেন, নাকি পানি নিয়ে চলে যাবেন চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলেন। অবশেষে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি মায়ের নিদ্রা ভঙ্গ করবে না। বরং পানির গ্লাসটি হাতে নিয়ে মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকবেন। যাতে জাগ্রত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি পান করাতে পারেন।

তখন ছিল শীতের মৌসুম। প্রবল শীতের প্রকোপে বায়েজীদের সারা দেহ অবশ হয়ে আসছিল। মায়ের নিদ্রা ভঙ্গ হচ্ছে না। ভীষণ ঠাণ্ডার মধ্যে বায়েজীদ দাঁড়িয়ে রইলেন। অবশেষে তাহাজ্জুদের নামাজের সময় হলে চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী মা জগত হয়ে দেখলেন- পানির গ্লাস হাতে পুত্র বায়েজীদ শিয়রে দণ্ডায়মান। অবাক বিস্ময়ে পুত্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? বায়েজীদ রাতের সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা দিলেন।


বায়েজীদ বললেন, আম্মাজান! আপনি রাতে আমার কাছে পানি চাইলেন। ঘরে পানি না থাকাতে আমি দূর থেকে পানি এনে দেখি আপনি ঘুমিয়ে পড়ছেন। আপনার কষ্ট হবে মনে করে নিদ্রা থেকে জাগ্রত করি নাই। মা বললেন, গ্লাস রেখে তুমি চলে যেতে পারতে। বায়েজীদ বললেন, আমি চিন্তা করলাম যখন আপনি আগ্রত হবেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে পানি না পেয়ে মনে মনে ভাববেন পুত্রকে পানি আনতে বললাম, সে আমাকে পানি পান না। করায়ে হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে। তাতে আপনি কষ্ট পাবেন। আগ্রত হওয়া মাত্রই যেন পানি দিতে পারি এই চিন্তা করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

কিশোর বালক বায়েজীদের মুখে এই কথা শুনে মা অত্যন্ত খুশী হলেন। দুচোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রুধারা নেমে আসল। তৎক্ষণাৎ হাত উত্তোলন করতঃ আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে লাগলেন, হে আল্লাহ! আমার এই পুত্রের উপর আমি সন্তুষ্ট। তুমিও সন্তুষ্ট হয়ে যাও। এই অধম দাসীর সন্তানটিকে তোমার প্রিয় আউলিয়াদের সরদার বা ইমাম বানিয়ে দাও। মাতৃহৃদয়ের অন্তঃস্থদের প্রাণ খোলা এই ধরনের আর্শীবাদ কখনও বার্থ হতে পারে না। জননীর এই মুনাজাত আল্লাহর আরশে পৌঁছে গেল। পরিণত জীবনে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) সত্যিই সমকালিন মুসলিম জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ অলী রূপে পরিগণিত হয়েছিলেন।


 হযরত বায়োজীদ বোস্তামী (রহ.) এর বাংলাদেশে আগমন সম্পর্কে বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন।


  • বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত শিক্ষাবর্ষ ২০১২ এর জন্য বাংলাদেশ মাদরাসা, শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত 'দাখিল ইসলামের ইতিহাস ১৮৬ পৃষ্ঠার আছে যে সমস্ত সূফী সাধকের আগমনের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ এদেশে ইসলাম প্রচার-প্রসার হয় তাঁদের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য সুলতানুল আরেফীন হযরত সুলতান বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.)। তিনি খ্রিস্টীয় নবম শতকে পারস্যে অঞ্চল হতে চট্টগ্রাম এসে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
  • ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ডক্টর গোলাম সাকলায়েন কর্তৃক রচিত 'বাংলাদেশের সূফী সাধক' এর ১১৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত, 'কথিত আছে যে, এই দরবেশ (হযরত বায়োজীদ বোস্তামী (রহ.) নবম শতাব্দীর শেষ ভাগে চট্টগ্রাম শহরের পাঁচ মাইল উত্তরে নাসিরাবাদের এক পর্বত চূড়ায় এসে পৌঁছেন। সেই সময় ঐ স্থান ছিল জনাকীর্ণ।  যা হোক, হযরত বায়োজীদ বোস্তামী (রহ.)  বোস্তামী চট্টগ্রাম এসে 'খানকা' প্রতিষ্ঠা করেন। তদানীন্তন সিন্ধুর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। তার  মোর্শেদ আবু আলী (রহ.) ছিলেন সিন্ধুর অধিবাসী। তিনি এই আবু  আলীর নিকট থেকেই সূফী মতবাদ 'ফনাহা'র বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন। আবু আলীয় নির্দেশ ও উপদেশক্রমেই তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলাম প্রচারকয়ে আগমন করেছিলেন। নাসিরাবাদের পর্বত চূড়ায় এখনও সমাধি প্রস্তর এখনও তাঁর স্মৃতি বহন করছে।"
  • ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাজী সৈয়্যদ আজিজুল হক শেরে বাংলা (রহ.), যিনি ‘ছাহেবে কাশফ' তথা এমন দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন যে, তাঁর শত শত বছর পূর্বে বেছালপ্রাপ্ত আউলিয়ায়ে কেরামের মধ্যেও কোন অণীর কি মর্যাদা, কার কি রকম আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সব তিনি জানতেন। তার অনেক প্রমাণ জীবদ্দশায় তিনি দিয়ে গেছেন। বিশেষত তাঁর রচিত ‘দেওয়ানে আজিজ এ অনেক কর্ণনাও দিয়েছেন। এমনকি অনেক মাজার, যেগুলো বাস্তবে কোন প্রকৃত অলীর মাজার ছিল না। তবে অজ্ঞতাবশত মানুষের আনাগোনা যুগ যুগ ধরে সেখানে চলে আসতেছে। এই রকম অনেক তত্ত্ব মাজারের সন্ধান পূর্বক প্রতিকারের ব্যবস্থাও তিনি করেছেন। তাঁর এক বিশেষ চরিত্র এই ছিল যে, বিচার-বিশ্লেষণ ব্যতীত হালকাভাবে তথ্য গ্রহণযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে দৃঢ় না হয়ে কোন কথা তিনি বলতেন না। এ জন্যেই আলেম ওলামা থেকে শুরু করে শিক্ষিত, অশিক্ষিত সবার কাছে তাঁর কথা গ্রহনীয়। তিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর চট্টগ্রাম আগমনের বর্ণনা দিতে গিয়ে স্বীয় কাব্য কিতাব দিওয়ানে আজিজ এ বলেন- তিনি বোস্তাম থেকে চট্টগ্রামে তাশরীফ এনেছেন। তাঁকে স্বাগতম। নাসিরাবাদের জঙ্গলকে তিনি আলোকিত করে দিয়েছেন। তাঁকে মারহাবা।
  • আলমগীর জলিল কর্তৃক রচিত অ্যার্জন পাবলিকেশন কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশের পীর দরবেশ পরিচিতি ১৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, "এই দরবেশ নবম শতকের শেষভাগে চট্টগ্রাম থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে নাসিরাবাদ গ্রামের কুমাদান পাহাড়ের ওপর এসে পৌঁছান এবং তাঁর মুরিদানদের নিয়ে এই টিলায় স্বীয় 'খানকা' প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম ইতিহাসের প্রাথমিক যুগের খোদা প্রেমিক সুফী সাধকের মধ্যে এই মনীষীর নাম বিশেষ স্মরণীয়। এই সূফী-সাধকের পুরা নাম সুলতানুল আরেফীন বুরহানুল মুহাক্কেকীন খলিফায়ে ইলাহী হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.)

তবে যে যাই মতামত যাই হোক না কেন ,হযরত বায়োজীদ বোস্তামী (রহ.)  ৮৫০ সালে ইরান থেকে সিন্ধু এবং সিন্ধু থেকে সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম আসেন এদেশে আগমন করেন।


চট্টগ্রাম এসেই তিনি নির্জনে একাগ্রচিতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য নাসিরাবাদের কুমাদান পাহাড়ের চূড়াকেই নির্বাচন করেন। সেখানে তিনি ইবাদতের একটি স্থান (যেখানে বর্তমানে দরগাহ্ শরীফ অবস্থিত)নির্দিষ্ট করলেন। তিনি যখন এবাদতে মশগুল হয়ে আল্লাহ্-আল্লাহ্ যিকিরে মগ্ন হতেন তখন তাঁর যিকিরের সাথে পাহাড় পর্যন্ত পান, সবই দুলতে  থাকতেন।


জ্বিন-পরী তাঁর যিকিরের আওয়াজে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করত। অনেকে এখানে বসবাস করা আর নিরাপদ মনে না করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হল। তবে অনেক জ্বিন তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সেখানে অবস্থান করে এবং তার সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি এবং জিকির-আজকারে শামিল হত।


তাই এখানকার বালুকণার মধ্যে আত্মার সাড়া পাওয়া যায়। পাখির কুঞ্জনের মধ্যে প্রেমময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আভাস পাওয়া যায়। গাছ-পালা এবং বায়ু-বাতাসের মধ্যে কার পূণ্য পরশ হিল্লোলিত হয়ে উঠে। এভাবে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর পবিত্র পদধূলির বদৌলতে সেই সময়কার ভূতপ্রেত ও মগের রাজ্য অরণ্য জঙ্গল নাসিরাবাদ ক্রমান্বয়ে শুধু ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পনগরীতে রূপান্তরিত হয়েছে তা নয় বরং তা আজ মহামানবের পবিত্রস্থান। পূণ্যাত্মার মিলনস্থল এবং জান্নাত নিশানে পরিণত হয়েছে।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) চট্টগ্রামে কতকাল অবস্থান করেছিলেন, কোথায় কোথায় ইসলাম প্রচার করেছিলেন তার বিস্তারিত বর্ণনা ইতিহাসে পাওয়া না গেলেও তবে চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার-প্রসার বিষয়ে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় কিংবা বিভিন্ন ঐতিহাসিকগণের পক্ষ থেকে যত গ্রন্থ রচিত হয়েছে সর্বটিতে একথা সুস্পষ্ট লিখা আছে যে, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) নাসিরাবাদের কুমাদান পাহাড়ে ইবাদত-বিয়ামত এবং ধ্যানে মগ্ন থেকে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলা ও অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। অনেকের মতে সন্দ্বীপ, বগুড়া এবং গৌড়েও তিনি ইসলাম প্রচার-প্রসার করেন।


মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তখন তাঁর আগমনের স্মৃতি হিসেবে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণকারী জ্বীনদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে কাছিমের মত রূপ দিয়ে উরু পাহাড়ের পূর্ব পার্শ্বস্থ বড় পুকুরে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। সেগুলো গজারী মাদারী নামে পরিচিত।


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর বিদায়কালে তারা বলল, হুজুর! আপনি চলে যাচ্ছেন, আমাদের খাবারের ব্যবস্থা কেমনে হবে? তিনি বললেন, তোমাদের খাবারের চিন্তা করতে হবে না। কিনয়ামত পর্যন্ত যত আল্লাহর বান্দারা আমার ইবাদত খানা ("বর্তমান দরগাহ্ শরীফ") যিয়ারত করতে আসবে তারা তোমাদেরকে খাবার দিয়ে আমার দরগাহের যিয়ারতে আসবে। তোমরা মেয়ে খাবার শেষ করতে পারবে না। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর অনন্ত কারামত আজ প্রায় বারশত বছর অতিক্রম হলেও এখনও তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি গজারী-মাদারী যেমনিভাবে বিদ্যমান, তেমনি দৈনিক হাজার হাজার আল্লাহর বান্দাগণ তাদেরকে আহার করানোর মাধ্যমে স্বীয় মনস্কাম পূর্ণ করে আসছে।


অন্য বর্ণনায় দুই প্রকৃতির কিছু কিছু দিন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর ইবাদতকালে বৃথা বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করলে তিনি তাদেরকে কাছিরের মত রূপ দিয়ে অর পুকুরে বন্দী করে রাখেন। ভারা ফরিয়াদ করুন, হুজুর! আমরা খাদ্য পাব কোথায়? তিনি বললেন- শতশত মানুষ পূর্ণ লাভের আশায় দরগাহ শরীফে আসবে এবং তোমাদেরকে খাদ্য দান করবে। সত্যিই তাই হল। দেশে ফিরে গেলেও চট্রগ্রামে তাঁর স্মৃতিস্বরুপ একটি রওজা শরীফ আছে।


add1


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর ইন্তেকাল কোন দিন হবে, সেই খবর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দান করেছিলেন। তবে এই খবর তিনি তাঁর শিষ্য, মুরীদ, ভক্ত কাউকে জানাননি। এমনকি কাউকে কিছু বুঝতেও দেননি। যেহেতু এই খবর সবাই জানলে হাজার হাজার লোক তাঁর সান্নিধ্যে শেষবারের মত একত্রিত হবে। ফলে জীবনের শেষ মুহুতটি একান্ত একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ধ্যানে ইবাদত-রিয়াযতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা সম্ভব হবে না।

তবে সেই দিন উপস্থিত তাঁর একনিষ্ট কিছু মুরীদ যারা অনেক দূর হতে ইন্তেকালের পূর্বের দিন তাঁর সাক্ষাতে এসেছিলেন। সাক্ষাত শেষে তাঁরা যখন চলে যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করছিলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বললেন, আগামীকাল সকালে একটি জানাযা হবে। জানাযাটা পড়ে তোমরা চলে যাবে। তাঁদের মধ্যে একজন তাঁর ছাত্র হযরত আব্দুল্লাহ ইউনাবাদী (রহ.)। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর কথাটির উদ্দেশ্য তাঁরা বুঝতে পারেন নাই বিধায় তাঁরা কাউকে কিছু বলেন নাই।


যেই রাতে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) ইন্তেকাল করেন, সেই রাতে তাঁর এক বিশেষ শিষ্য হযরত আবু মুসা (রহ.) অন্যত্র অবস্থান করছিলেন। রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি আল্লাহর আরশ মাথায় নিয়ে হাটছেন। এই অপূর্ব স্বপ্ন দর্শন করে তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে যান এবং এটার তাবীর (স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য সকালেই হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর বাড়ি বোঝামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। বোস্তাম পৌঁছে দেখলেন যে, হুজুর হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) আর দুনিয়াতে নেই। ইহধাম ত্যাগ করে আল্লাহর দীদারে চলে গেছেন। হাজার হাজার লোক তাঁর কঠিন মাথায় নিজের নামাজের উদ্দেশ্যে গয়না হয়েছেন। তখন দৌড়ে গিয়ে তিনিও খাটের নিচে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে খাট বহনকারীদের সাথে সামিল হলেন। এমন সময় হঠাৎ তাঁর মনে রাতের স্বপ্নের কথা স্মরণ হল। স্বপ্নের ব্যাখ্যা বুঝতে তাঁর কাছে আর বাকী রইল না। তিনি নিশ্চিত হলেন যে, আমি যে আল্লাহর আরশ মাথায় নিয়ে হাঁটতে দেখলাম, আমার হুজুরের এই পবিত্র খাটই হল আল্লাহর সেই আরশ।


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) শেষ বয়সের সিংহভাগ সময় নিয় বাড়ি বোস্তামেই অতিবাহিত করেন। তাঁর হুজরা মুবারকের পাশে তাঁরই নির্মিত একটি মসজিদ ছিল। সে মসজিদে ছাত্র, মুরিদ, ভক্ত অনুরক্ত এবং এলাকাবাসী সবাইকে নিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সহিত আদায় করতেন। আপন হুজরা শরীফে দিনের বেলায়  প্রায় সময় ছাত্র-শিয়া এবং আগত সাক্ষাতকারীদের কুরআন-হাদীসের তালিম, ওয়াজ-নসীহত এবং দোয়া প্রার্থনা ইত্যাদিতে রত থাকতেন। এশার নামাজের পর সবাইকে বিদায় করে দিয়ে হুজরা শরীফের দরজা বন্ধ করে ইবাদত-রিয়াযত, মুরাকাবাহ- মুশাহাদাহ এবং আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। মসজিদের মুয়াজ্জিন, যিনি তাঁর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তিনি নামাজের সময় হলে তাঁকে স্মরণ করে দিতেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) সবাইকে নিয়ে মসজিদে চলে যেতেন। এটা ছিল তাঁর নিত্যদিনের নিয়ম ।


যে রাতে তিনি ইন্তেকাল করবেন সে রাতে চিরাচরিত  নিয়মানুযায়ী এশার নামাজের পর সবাইকে বিদায় দিলেন। হুজরা মুবারকের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এমনিতে দিনে-রাতে সবসময় স্বাভাবিকভাবে তাঁর মুখে আল্লাহ আল্লাহ্ যিকির জারী থাকত, কিন্তু আজ ভিন্ন মনে হচ্ছে। অধিক কান্নাকাটির সাথে যিকিরের আওয়াজ এত বেশী বড় হল বাইরে অবস্থানরত ভক্তরা শুনতে পাচ্ছেন। গভীর রাতে মাওলার দরবারে এই বলে প্রার্থনা করতে লাগলেন হে আল্লাহ! হে দয়াময় ক্ষমাশীল প্রভৃ! অলসভাবশত: আজীবন তোমার ইবাদত-বন্দেগী হতে দূরে সরে রয়েছি। এমনকি শেষ জীবনেও তোমার ইবাদতের দিকে ধাবিত হতে পারলাম না। কি নিয়ে কিভাবে তোমার দরবারে উপস্থিত হব আমার বেশী ভয় হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও আমি আশাবাদী যে, তুমি আমাকে নিজ দয়াগুণে ক্ষমা করে কবুল করে নিবে। এভাবে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে বলাতে ঠিক ঐ সময়ে (তাহাজ্জুদের নামাজের সময়) যে সময় আল্লাহ তায়ালা বান্দার বেশী নিকটবর্তী হয়ে অতি করণগুরে বান্দাকে ডাকেন কে আছ আমার সাথে সাক্ষাতকারী আমি তাকে সাক্ষাত দিব। সেই সময়ে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) আল্লাহ্ ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন।


মুয়াজ্জিন তাহায্যুদের নামাজের জন্য অন্যদিনের মত তাঁকে ডাকলে ভিতর থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করে দিলেন। অনেকে একত্রিত হয়ে দরজায় আঘাত করল। সাড়া শব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙ্গে প্রবেশ করে দেখতে গেলেন, হুজরা মুবারক অদৃশ্য নূরে আলোকিত এবং বেহেস্তী সুবাসে সুগন্ধময়। আর হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) লক্ষ লক্ষ ভক্ত-অনুরষদের শোক সাগরে ভাসিয়ে আল্লাহর রাসূলের (স.) দীদারে চিরকালের জন্য চলে গেলেন। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজেউন)। মুহুর্তের মধ্যে সারা বোস্তামে শোকের ছায়া নেমে আসে। চতুর্দিক হতে পঙ্গপালের ন্যায় হাজার হাজার লোক তাঁর বাড়িতে সমবেত হতে লাগল। সেদিন সকালে বিশাল জানায নামাজের মাধ্যমে হাজার হাজার ভক্ত অনুরক্ত, শিষ্য, মুরীদগন  এবং বোস্তামবাসী এ মহান সাধকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জানাযা শেষে তাঁর হুজরা শরীফে তাঁকে দাফন করা হয়।


অধিকাংশ গ্রহণযোগ্য তথ্য মতে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) ২৬১হিজরী , ৮৭৪ সালে ইন্তেকাল করেন।

৭১৩হিজরীতে সে যুগের ইলখানী সুলতান উপজায় মুহাম্মদ খুঁদাবানদা তাঁর সমাধির উপর মাযার এবং গম্বুজ নির্মাণ করেন।


Post a Comment

0 Comments