
১৩৪০ সালে সোনার গাঁওয়ের স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহর সেনাপতি কদলখান গাজির সহায়তায় পীর হযরত বদরুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) তাঁর সহচরদের নিয়ে মগদস্যুদের পরাস্ত করে চট্টগ্রাম জয় করলে এখানে ইসলামী শাসনের সূচনা হয়। খ্যাতনামা বারোজন সূফী সাধক ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম এসেছিলেন। চট্টগ্রামস্থ সীতাকুণ্ড থানার সোনাইছড়ি অঞ্চলে যা পরবর্তীকালে বার আউলিয়া নামে সর্বত্র প্রচারিত ও প্রকাশিত তথায় তাঁদের আস্তানা দৃষ্ট হয়। বাংলাদেশের মুর্শিদাবাদ, জাহাঙ্গীর নগর ও ইসলামাবাদ মুঘল আমলের শেষের দিকে সূফীদের আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হিসাবে ব্যাপক প্রসার লাভ করে। হযরত শাহ সূফী বখতেয়ার মাহি সওয়ার (রহ.) প্রমুখ আরবীয় সূফী ঐ সময় চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাই চট্টগ্রাম সূফী সাধকদের প্রবেশদ্বার রূপে চিরকাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
চট্টগ্রাম পাহাড় পর্বত ঘেরা নির্জন পরিবেশ মন্ডিত এলাকা। চট্টগ্রামের এই প্রকৃতি পরিবেশ যেন রাব্বুল আলামীন শুধু সূফীদের আত্মিক ক্রিয়াকলাপের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করেছেন। তাই চট্টগ্রামের সাথে সূফী সাধকদের চমৎকার আধ্যাত্মিক ও জাগতিক যোগাযোগ লক্ষ্যনীয়।
বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রাম। ইসলামের বাণী প্রচারে অন্ধ ধর্ম থেকে পবিত্র আলোকময় জীবনদানের জন্য যুগে যুগে সৎ, মহৎ ও আদর্শ পবিত্র বাণী নিয়ে মানবতার কল্যাণে মহৎ আদর্শবাদীরা আলোকিত পথ দেখিয়েছেন মানুষকে। চট্টগ্রামের বার জন আউলিয়া সূফীতত্ত্ব বিকাশের ও মানব কল্যাণে কাজ করে চট্টগ্রামকে পবিত্র ধর্ম ইসলামের বাণী মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন যারা হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) তাদের মধ্যে অন্যতম এবং প্রথম সারীর একজন কামেল অলী-আল্লাহ ।
ঐতিহাসিকদের মতে কাদেরীয়া তরীকার প্রবক্তা প্রখ্যাত সাধক বড়পীর হযরত মহিউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) এর বংশধর হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর জন্মস্থান ভারতের বিহারে ১০৯৫ আরবি হিজরী মোতাবেক ১৬৮৫ সালে। তাঁর পিতা নিয়ামত আলী শাহ (রহ.), পিতামহ শায়খ ছয়রুদ্দিন শাহ (রহ.)।তাঁদের পূর্বপুরুষের নিবাস ছিল ইরাকে। ভারতের বিহারের প্রখ্যাত সাধক সুফী হযরত মোনামেয় পাকবাচ (রহ.) তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ বংশ পরম্পরায় বুজুর্গ ছিলেন।
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর পিতা ও পিতামহ দুজনেই পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচার প্রসারে বিহারে ভূমিকা রাখেন। শিশু আমানত শাহ বাল্যকালেই পিতার কাছ থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। যুবক বয়সে ধর্ম ও আত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি কামেল মুর্শিদের সন্ধানে কাশ্মীরে গমন করেন। কাশ্মীরের জনৈক বুজর্গ ব্যক্তি তাঁকে মহান অলী হযরত আবদুর রহিম শহীদ (রহ.) এর সন্ধান বলে দেন।
সেখানে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন বিখ্যাত সাধক আবদুর রহীম শহীদ (রহ.) লক্ষ্ণৌ অবস্থান করছেন। হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) সাথে সাথে বিপথ পদ অতিক্রম করে লক্ষ্ণৌতে চলে যান।
লক্ষ্ণৌতে পৌঁছলে আমানত শাহ জানতে পারেন প্রিয় মুর্শিদ লক্ষ্ণৌতে নেই, তিনি ঐ সময় বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে অবস্থান করছেন। হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) ব্যাকুলচিত্তে আবার পথ পাড়ি জমান মুর্শিদাবাদের দিকে। অবশেষে মুর্শিদাবাদে গিয়ে হযরত শাহ সূফী আবদুর রহীম শহীদ (রহ.) -এর সাথে সাক্ষাত হয়।
হযরত শাহ সূফী আবদুর রহীম শহীদ (রহ.) দয়ার দৃষ্টি তাঁর পরে নিপতিত হলো। তাঁর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন এলমে মারেফতে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। সেই জ্যোতির্ময় পুরুষের সান্নিধ্য পেয়ে তিনি অত্যন্ত গৌরবান্বিত হলেন। মাত্র অল্পকালের মধ্যে তিনি মুর্শিদের সাহচর্য থেকে এলমে মারেফত শাস্ত্রে চরমোৎকর্ষতা লাভ করে অফুরন্ত নেয়ামত হাসিল করলেন। হযরত শাহ সূফী আবদুর রহীম শহীদ (রহ.) বুঝতে পারলেন হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর অন্তর আল্লাহ প্রেমের জোয়ারে পরিপূর্ণ এবং রাব্বুল আলামীনের সাথে মিলনাকাঙক্ষায় মন তাঁর উন্মুখ। এমন এক প্রেমাস্পদের সন্ধান পেয়ে মুর্শিদ অত্যন্ত আশান্বিত হলেন। হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) তাঁর মুর্শিদের দরবারে গোলামী করে ১২ বৎসর অতিবাহিত করেন।
অবশেষে স্বীয় মুর্শিদ তাঁকে কাদেরীয়া, নকশবন্দীয়া এবং মাদারীয়া তরীকায় খেলাফত প্রদান করতঃ বিবাহিত জীবন যাপনের মাধ্যমে হালাল উপার্জন করার উপদেশ দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় শহর চট্টগ্রাম যেতে নির্দেশ দিলেন। ১১২০ হিজরী সনে হযরত শাহ সূফী আবদুর রহীম শহীদ (রহ.) তদীয় ভ্রাতুষ্পুত্র হযরত নাজিমুদ্দীনকে নিয়ে মখসুসাবাদ ত্যাগ করে ঢাকায় তশরীফ নিয়ে এলেন। এখানে এসে তিনি লক্ষ্মীবাজারে একটি খানকাহ স্থাপন করে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
অতঃপর পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারে হযরত শাহ সূফী আবদুর রহীম শহীদ (রহ.) এর নির্দেশে শাহ আমানত চট্টগ্রামে গমন করেন। চট্টগ্রামের আত্মিক জগতের কর্তৃত্বের ভার গ্রহণ করে হযরত শাহ সূফী আমানত খান (রহ.) অত্যন্ত ধন্য হলেন। জরাজীর্ণ পাহাড়-পর্বত নদীমাতৃক চট্টগ্রাম এসে তিনি হালাল রুজির পথ খুঁজতে থাকেন এবং সৎরুজির সন্ধানে চট্টগ্রামের আদালতের জজ সাহেবের পাখা টানার কাজ গ্রহণ করেন। (ঐ সময়কার নবাবী আমলের আদালতটি পরবর্তীকালে মোহসেনিয়া মাদ্রাসা এবং তারও পরে মহসিন কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।)
ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম ও ইতিহাস গবেষক আহমদ মমতাজ -এর গ্রন্থে ঐ সময়ে সূফী সাহেব কোন এক মহীয়সী রানীকে বিবাহ করেন। হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) দিনের বেলায় হযরত আদালতের কাজে এবং রাত্রি বেলায় আধ্যাত্মিক সাধনায় ব্যাপৃত হলেন। পার্থিব জগতের মায়া মমতা তাঁকে আর গৃহাভিমুখী করতে পারলো না। আদালতে কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি এবাদত বন্দেগীর জন্যে একটি নিরিবিলি স্থানের খোঁজ করছিলেন। অতঃপর একদিন আন্দরকিল্লা পাহাড়ের পাদদেশে পীর হযরত বদর শাহ আওলিয়া (রহ.) সমাধির কিছুটা পশ্চিমে বদর পুকুরের পশ্চিম পাড়ে একটি নিরিবিলি স্থান নির্বাচন করে তথায় তিনি খানকাহ স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে ঐ স্থান খানকাহ আমানতিয়া নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
ঐতিহাসিক মতে, হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) চট্টগ্রাম আগমনের পূর্বে এ শহরের কুতুবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন (আত্মাত্ত্বিকভাবে) হযরত সূফী শাহ প্রকাশ বদনা শাহ (রহ.)। ১৭৬১ সালে চট্টগ্রাম বাংলার নবাব মীর কাশিম খা কর্তৃক সনদ মূলে ইংরেজদের হাতে চলে যায়। এর কয়েক বছর আগে সমগ্র ভারতের অনেক গুলো দেশীয় রাজ্য ইংরেজদের করলগত হয়। ইংরেজরা মুসলমানদের হাত থেকে তাদের সাম্রাজ্য, জমিদারী কেড়ে নেওয়ার পর তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা, ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সমূহ বাতিল করে দিতে থাকে।
মুসলিম আলেম-ওলামা সমাজ ও মসজিদ, খানকা, মাজার সমূহ সংকটের মুখোমুখি হয়। মুসলমান শাসনামল থেকে প্রচলিত সরকারি ভাষা ফার্সি নিষিদ্ধ করে তৎস্থলে প্রচলন করা হয় ইংরেজদের ভাষা।
এ সময় শহর কুতুব সূফী বদনা শাহ (রহ.) এর তীব্র প্রতিবাদ করলে ইংরেজরা তাকে বিচারের সম্মুখীন করেন। এতে ইংরেজ জজ শহর কুতুব শাহ সূফী হযরত সফি প্রকাশ বদনা শাহ (রহ.) -কে পাগল সাব্যস্থ করে জেলে পাঠান। সাধক পুরুষ সফি শাহ (রহ.) জেলেই মৃত্যুবরণ করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পশ্চিম গেইট সংলগ্ন এলাকাতে প্রখ্যাত সাধক পুরুষের মাজার রয়েছে।
চট্টগ্রামের ‘শহর কুতুব’ আধ্যাত্মিক শূন্যস্থান পূরণ করতেই হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর চট্টগ্রাম আগমন।
ইতিহাসবিদদের মতে- হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) সাহেব চট্টগ্রাম আগমনের সময়কাল ধরেন ১৮ শতকের আশি বা নব্বই দশক। হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর কয়েকজন শিষ্যের কথা আহমদ মমতাজের ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায় তাঁরা হলেন, “হযরত শাহ সূফী মোহাম্মদ দায়েম (ইন্তেকাল ১২১৪ হিজরি, আজিমপুর দায়রা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা), হযরত শাহ সূফী কেয়ামুদ্দীন আল মাদানী (জন্ম মীরসরাই, মৃত্যু ১৭৯৬ সাল- মোতাবেক ১১৫৮ হিজরী সন, মাস্তাননগর হাসপাতালের পূর্ব দিকে তাঁর মাজার শরীফ রয়েছে), হযরত শাহ সূফী হাজী মুহাম্মদ দৌলত, জনশ্রুতিমতে, তিনি চট্টগ্রামের শাসক নবাব ইয়াছিন খার (১৭১৯-২৬) পৌত্র ছিলেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর গ্রামে তাঁর মাজার শরীফ ও মসজিদ সংরক্ষিত আছে।
আদালতের কর্মজীবনে হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) নম্র ব্যবহার, পরম ধৈর্য্যগুণ এবং মৌনতা দিয়ে সকলের মন জয় করেছিলেন। এসময় তিনি স্থানীয় জনগণের কাছে ‘মিয়া ছাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি সব সময়ই এহরামের কাপড়ের মত সাদা কাপড় পরিধান করতেন। সারাদিন আদালতে দায়িত্ব পালন আর রাত্রি জেগে জীর্ণ কুঠিরে আল্লাহ পাকের ধ্যানে মোরাকাবা করতেন। নিজের সত্যিকারের পরিচয় তিনি গোপন রেখেই চলেছিল জীবন। জাগতিকতার আবরণে চাকুরির ছদ্মবেশে তিনি দিনের বেলা যদিও কাজ করতেন কিন্তু গভীর রাত্রি পর্যন্ত তিনি মরমীবাদের কঠোর সাধানায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। এমনই এক মহেন্দ্রক্ষণে এক চরম অসহায় ব্যক্তিকে মামলার দলিলপত্র সংগ্রহে সাহায্য করতে গিয়ে জনসমক্ষে তাঁর আধ্যাতিক আবরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। পানিতে রুমাল বিছিয়ে সাম্পান বানিয়ে চোখের পলকে দুর্গম সমুদ্রের শত মাইল পথ সংকুচিত করে মুহুর্তের মধ্যে মামলার কাগজপত্র সংগ্রহের অত্যাশ্চার্য আলৌকিক ঘটনার কিংবদন্তি আজও বংশ পরম্পরায় চট্টগ্রামবাসীর মুখে মুখে উচ্চারিত।
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর কারামত নিয়ে আলোপাত করা হলো।রুমাল যখন সাম্পান: মহেশখালীর এক বাসিন্দা চট্টগ্রামে এসেছিলেন বাজার করতে। ফিরতে পথে তার এক পুরাতন মামলার খবর জানতে উকিলের কাছে গিয়ে জানতে পারেন আগামীকালই তার মামলার তারিখ পড়েছে। সংবাদ শুনে লোকটির মাথায় যেন বজ্রাঘাত পড়ে। পুরাতন মামলা মনে করে এত তাড়াতাড়ি তারিখ পড়বে আর তাছাড়া পুরাতন কাগজপত্র সংগ্রহ করা এবং রাতের মধ্যেই দলিলাদি বাড়ি থেকে এনে আদালতে দাখিল করাও সম্ভব না ভেবে লোকটি মুষড়ে পড়েন। উকিল সাহেব আদালতে সময় প্রার্থনা করে সময় বাড়িয়ে নেবেন বলে তাকে আশ্বস্ত করে। কিন্তু পরদিন উকিল সাহেবের সময়ের প্রার্থনা আদালতে নামঞ্জুর হয় এবং পরদিনই শুনানীর তারিখ ধার্য্য করেন। এ সংবাদে লোকটি যার পর নাই বিচলিত হয়ে পড়েন। মুকদ্দমায় হেরে গেলে সারাজীবনের কষ্টার্জিত সহায় সম্পদ হাতছাড়া হয়ে পথে বসতে হবে ভেবে কাঁদতে শুরু করেন। আদালতের ছুটি শেষে হজরত পথিমধ্যে দেখেন লোকটি সব সম্পদ হারানোর ভয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হজরত স্নেহের হাতখানি লোকটির মাথায় রেখে জিজ্ঞেস করেন, “সম্পত্তিগুলো কি হালাল উপায়ে অর্জন করেছেন?” লোকটি জবাব দেয়, “হ্যা সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে অর্জন করেছি।”
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) মাগরিবের নামাজের পর সদরঘাটে আসতে বলে চলে যান। লোকটি আদালতের সামান্য বৃত্তিজীবির এমন আন্তরিকতা এবং সৌম্যদীপ্ত চেহারা দেখে চোখের পানি সহসা মিলিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর নির্জন স্থানে হজরত লোকটি বললেন, মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে তার যদি কোন উপকার করে দেন তবে শপথ করতে হবে এ বিষয়টি অন্য কাউকে জানাতে পারবে না। লোকটি কাউকে জানাবে না বলে শপথ করে। এর আগে লোকটি মনে মনে ভেবেছিল হয়ত লোকটি আমার মুকাদ্দমার জন্য হাকিমের কাছে সুপারিশ করবে। কিন্তু বর্তমান চেহারা দেখে তার মনে এক আলোড়ন সৃষ্টি হলো।
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) নিজের শরীরে জড়ানো সাদা চাদর খানা কর্ণফুলীর পানিতে বিছিয়ে দিয়ে বললেন, ‘রুমালখানায় আরোহণ করলেই ওটা সাম্পানে পরিণত হবে এবং চোখ বন্ধ করলেই সেটা চলতে থাকবে। সাম্পান কোথাও ঠেকলে চোখ খুলে নেমে পড়তে হবে এবং ওই স্থানটাই বাড়ি ঘাট। নথিপত্র নিয়ে সাম্পানে চেপে আবার চোখ বন্ধ করতে হবে।’
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর কথা মত লোকটি রুমালে পা রেখে চোখ বন্ধ করতেই চলতে শুরু করে সাম্পান এবং বাড়ি ঘাটে গিয়ে থামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যথারীতি ফেরত আসেন মুহুর্তের মধ্যেই। অসহায় মানুষের কান্ডারী হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) বাক্য ব্যয় না করে প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে নিজ কুঠিরে ফিরে যান।
পরদিন আদালতে মামলার নথি কোথা থেকে এল হাকিম জানতে চাইলে লোকটি আমতা আমতা করে আত্নীয়ের বাড়ি ছিল। কিন্তু আদালত তার কথায় বিশ্বাস না করে জেরা করতে থাকেন এবং সত্য না বললে সাত বছরের জেল হতে পারে বলে জানিয়ে দেন। লোকটি তখন ভয়ে ভয়ে গতরাতে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা দেন। সাথে সাথে হামিক সাহেবে মনে যেন এক দমকা হাওয়া বয়ে যায়। লুটিয়ে পড়েন হজরতে পায়ে। সেদিনই শেষ হয় হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর কর্মজীবন।
চাদরের নীচে নূর: হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) কদম মোবারক মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতেন। এ সময় ঘড়ির ব্যবহার না থাকায় বেলা দেখে দেখে নামাজ আদায় করা হতো। এক জুমার দিন মুসুল্লীরা ইমাম সাহেবকে নামাজ পড়ানোর জন্য বার বার তাগাদা দিচ্ছে। কিন্তু ইমাম সাহেব হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সাদা কাপড়ে দেহাবৃত্ত জ্যোতির্ময় পুরুষ এলে মুয়াজ্জিন আজান দিয়ে নামাজ শুরু করেন। এদিকে অনেক মুসুল্লীদের মধ্যে এক যুবক দেরীতে নামাজ পড়ানো জন্য ইমাম সাহেব দায়ী করেন। তখন তিনি স্মিত হেসে যুবকটিকে নিজের চাদরখানা আপাদমস্তক ঢেকে দিয়ে চোখ বন্ধ করতে বললেন। কথা মত যুবকটি চোখ বন্ধ করতেই চোখের পর্দায় ভেসে উঠে এক নূরানী সমজিদ, সেখানে মুয়াজ্জিন সাহেব অজু করছেন আজান দেয়ার জন্য।
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) চাদর সরিয়ে নিলে মুহুর্তের মধ্যে মিলিয়ে যায় দেদীপ্যমান মসজিদখানা। তাঁকে ঘিরে থাকা অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে অসংখ্য নামাজীর কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। ক্ষমা প্রার্থনা করেন তাঁর কাছে। পরবর্তীতে যুবকটি হুজুরের খানকায় আসে। তার চরম ধৈর্যশীলতা, পরম বুদ্ধিমত্তা, সাহসিকতা এবং কল্বের যাবতীয় গুণাগুণের জন্য অত্যন্ত খুশী হয়ে হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) তাকে ছবক দিয়ে বায়াত প্রদান করেন। আর এই যুবকই হলো প্রখ্যাত খলিফা হজরত শাহ্ সূফী মোহাম্মদ দায়েম (রহ.) ।
নিরক্ষর হয় উকিল, পায় খ্যাতি, অত:পর শাস্তি: হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর খানকায় খোসামাবুদি নামে এক বিধবা মহিলা খেদমত করতেন। আবদুল ওয়াহাব নামে তার এক কিশোর ছেলে ছিল। শহরের বিভিন্ন জায়গায় কাজের চেষ্টা করেও কোন কাজ পায়নি ছেলেটি। অত:পর হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর কাছে বিষয়টি জানালে বলেন, তোমার ছেলেকে আদালতে গিয়ে ওকালতি করতে বলো। হুজুরের কথা কিছুই না বুঝে একদিন কোর্টে গেলে সত্যি সত্যি আদালতের হাকিম সাহেব তার হাতে একখানা ওকালত নামা ধরিয়ে দেন। পরবর্তীতে এই আবদুল ওয়াহাব চট্টগ্রামে কোর্টের একজন নামকরা উকিল হন। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে খ্যাতি। হয় অর্থ-বিত্তের মালিক। হুজুরের অনুমতি নিয়ে উকিল আবদুল ওয়াহাব শহরের নানা পেশার মানুষের জন্য এক মেজবানির আয়োজন করেন। কথা ছিল সকল মানুষের জন্য একই খাবার ও বিছানার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু উকিল সাহেব অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলে সেখানকার দারোয়ানরা হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.)-কে ঢুকতে দেয়নি এবং তিনি জানতে পারেন যে, সেখানে বিছানা ও খাবারের মধ্যে বৈষম্য করা হয়েছে। হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) অনুষ্ঠানস্থলের কিছুদুর যেতে না যেতেই পুরো অনুষ্ঠানস্থল আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়েন আবদুল ওয়াহাব।
এমনি অসংখ্য কারামতের মধ্যে আছে সাধু সন্তের ইসলাম গ্রহণ, হযরত দায়েমের (রহ.) কারামাত প্রদর্শনের দরুন কারামতের ক্ষমতা প্রত্যাহার, অন্ধের চোখে আলো দান, সংযমহীন দরবেশের শাস্তি, বিনা মৌসুমে কুল ফল, কুঁজো সাত্তারের সুস্থতা লাভ, অলৌকিক বস্ত্র লাভ যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন সেসময়কার ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা।
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর পবিত্র দর্শন লাভের মানসে ভক্তগণ বিচলিতভাবে খানকাহ শরীফের পার্শ্বে পায়চারী করতেন। অত্যন্ত ধীন পদক্ষেপে অভ্যাগতদের সামনে এলে হজরতের নূরানী চেহারা মোবারক জ্যোতির্ময় চাঁদের মতো চমকাতো এবং সারা মুখমন্ডল ঘিরে নূরের প্রভা বিকশিত হতো। ভক্তরা তাঁকে এক নজর দেখেই আবেগে আত্মহারা হতেন। তখন ভক্তদের অবস্থা এমন হতো যে, বেহেস্তের মনোমুগ্ধকর পরিবেশে ঐশ্বরিক আকর্ষণে বিভোর অন্তর যেন জিকির এর স্পন্দনে আন্দোলিত হত। উপস্থিতি সকলের মাঝে রূহানী ফায়েজ এমনভাবে প্রবাহিত হতো যে, খানকাহ্ শরীফে প্রতীক্ষারত কোন ভক্তই কাঙ্খিত ফল লাভে বঞ্চিত হতেন না। মৌনতা অবলম্বনকারী, প্রচার বিমুখ এই আধ্যাতিক সাধক আদবের অত্যন্ত সমাদর করতেন কিন্তু বে-আদবকে তিনি কখনো প্রশয় দিতেন না।
হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) ১১৮৭ হিজরী সনের জিলক্বদ মাসে তিনি ওফাত লাভ করবেন এটা বুঝতে পেরে তাঁর পুত্র হযরত শাহজাদা আনোয়ার খান (রহ.) এবং খাদেমকে ডেকে বলেন, বাঁশের চুঙ্গির ভিতর কাফনের কাপড় আছে। আমার মৃত্যুর পর গোসল শেষে সামনের খোলা মাঠে নিয়ে যেতে হবে জানাজার জন্য। কিন্তু কেউ ইমামতি করবে না। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেই শ্বেতবর্ণের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সাদা চাদরে মুখমন্ডল আবৃত একজন লোক আসবেন এবং উনিই আমার জানাজার নামাজের ইমামতি করবেন।
১১৮৭ হিজরীর ৩০ শে জিলক্বদ, বৃহঃস্পতিবার ১২৫ বৎসর বয়সে নিজ খানকাহ্ শরীফে ওফাত লাভ করেন। (আজিমপুর দায়েরা শরীফ পৃষ্ঠা-১১০ সৈয়দ শাহ আহমদুল্লাহ)।
তাঁর ওফাতের পর চারিদিকে শোকাহত মানুষের ঢল। প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদে মানসিক যন্ত্রণায় কাতর সবাই। হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) এর শেষ ওছিয়ত মোতাবেক মৃত্যু পরবর্তীকালে গোসল শেষে বাঁশের চ্ঙ্গুা থেকে কাফনের কাপড় বের করে পড়ানো হয়। অত: পর খোলা মাঠে খাটিয়া রেখে মুসুল্লীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতেই দেখা যায় একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে এক জ্যোতির্ময় পুরুষ এসে ইমামতির জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। মুখ ঢাকা থাকায় কেউই তাকে দেখতে পারেননি। জানাজা শেষে কিছু বুঝে উঠার আগেই মুহুর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যান আগন্তক। উপস্থিত মুসুল্লীদের মধ্যে অনেকেই বলাবলি করতে থাকেন, তাহলে কি হযরত শাহ সূফী হযরত আমানত শাহ (রহ.) নিজের জানাজায় নিজেই ইমামতি করলেন? চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির পূর্ব দিকে তার সমাধিসৌধ অবস্থিত।
0 Comments