Header Ads Widget

হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.)

 


মিরপুর তথা ঢাকার অন্যতম প্রখ্যাত সূফী সাধক ‘সুলতানুল আউলিয়া হযরত সৈয়দ শাহ্ আলী বাগদাদী (রহঃ) ছিলেন হযরত আলী (রাঃ) এর২১তম  বংশধর । ১৩৯১ সালে বাগদাদের ফোরাত নদীর তীরবর্তী কসবা তো জন্মগ্রহণ করেন।

হযরত ইমাম হোসাইন হতে ইমাম আলী নকীর পিতা পর্যন্ত তার পূর্বপুরুষগনের মধ্যে সকলেই বসবাস করতেন মদিনায়। তাঁর বংশ হতে শাহ সৈয়দ সুলতান আলী সর্বপ্রথম বাগদাদে আসেন, যিনি ছিলেন ইমাম আলী নকীর ছোট ভাই। বাগদাদের বাদশাহ সৈয়দ ফখরুদ্দিন রাজির জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন সৈয়দ শাহ আলী বোগদাদী (রহঃ)

১৪১৯-২০ খিৃষ্টাব্দে হযরত সৈয়দ শাহ্ আলী বাগদাদী (রহঃ) সুদূর বাগদাদ থেকে,  ইসলাম প্রচার করার জন্য তার আপন ভাগিনা হযরত শাহ হাবিব (রহ.) কে সঙ্গে  নিয়ে  এবং ৪০ জন সঙ্গীসহ বাগদাদ ত্যাগ করেন এবং  তিনি দিল্লীতে আগমন করেন।

দিল্লীতে অবস্থানকালে তিনি রাজ-আনুকূল্য পান এবং রাজার শ্রদ্ধাভাজন অতিথি হিসেবে সকলের নিকট গৃহীত হন। তাঁর সঙ্গে তাঁর ভাগ্নে শাহ হাবিবও ছিলেন।

দিল্লীতে অবস্থান কালে দিল্লীর সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দীন তাঁর কন্যার সঙ্গে হযরত শাহ্ আলী(রহঃ)-এর বিয়ের প্রস্তাব করেন। হযরত শাহ্ আলী (রহঃ) প্রথমে এ বিয়ের প্রস্তাবে স্বীকৃত ছিলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজার বিশেষ অনুরোধে তিনি রাজকন্যা আয়েসার সাথে এ বিয়ে কবুল করেন। বাহলুল লোদির আক্রমনে দিল্লী যখন বিপর্যস্ত তখন গুলমুহাম্মদ সওদাগরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দিল্লীত্যাগ করেন

তিনি বাগদাদ থেকে আসার সময় সাথে এনেছিলেন রাসূল (সাঃ)-এর কেশ মোবারক, হযরত আলী (রাঃ)-এর জুলফ, হযরত হোসেন (রাঃ)-এর মাথার পাগড়ী, হযরত বড় পীর আবদু কাদের জিলনী(রহঃ)এর জুব্বা এবং আরও অন্যান্য জিনিস পত্র।এ সকল ইসলামি নির্দশনাদী রক্ষনাবেক্ষন করার নিমিত্বে ঢোল সমুদ্রের তীরে ১২০০০ হাজার বিঘা পরিমান জমি তাঁকে লাখেরাজ ( নিস্কর ভূসম্পত্তি) প্রদান করেন।

দিল্লির রাজবংশের শেষ সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের পতনের পর ১৪৫১ সালে তিনি দিল্লি থেকে নৌকা যোগে বাংলাদেশের ফরিদপুরে চলে আসেন এবং ফরিদপুরের গের্দায় সুলতান কতৃক প্রাপ্ত  ভুসম্পওি লা-খেরাজ বসতি স্থাপন করেন। কসবা র্গেদা ছিলো ঢোল সমুদ্রের তীরে। ঢোল সমুদ্র এককালে একটি বিরাট হ্রদ ছিলো এবং যমুনা নদীর সাথে সংযুক্ত ছিলো। বর্তমানে ঢোল সমুদ্র বিশুষ্ক প্রায়, যদিও এ নামটি এখনও প্রসিদ্ধি রয়েছে। তিনি গের্দ্দায় গদি স্থাপন করেন। তাঁর এ গদি থেকেই এ অঞ্চলের নামকরন হয় গের্দ্দা। ঢোল সমুদ্রের দক্ষিণ তীরে এক যোগী বসবাস করতো।যাদুর কৌশলে মায়ার ইন্দ্রজালে মানুষকে ভক্ত করে রাখা হতো এবং ক্ষমতাধর ব্যাক্তি ছিলেন। এমনকি হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর ইসলাম প্রচারেও সে বাধার সৃষ্টি করে। কাজেই হযরত শাহ আলী (রহ.) আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকে নিপাত করে বিজয় লাভ করেন।

ফরিদপুর অঞ্চলটি তখন ছিল ধলেশ্বরী পরগনা নামে। আর পরগনার অধীশ্বর ছিলেন রাজা হরিশচন্দ্র। রাজা হরিশচন্দ্র মোটামোটি প্রতাপশালী ছিলেন। গের্দা ছিল বিধর্মীদের মূল বসতি স্থান। রাজা হরিশচন্দ্রের কন্যা সম্পর্কে ফরিদপুর অঞ্চলে একটি চমকপ্রদ কাহিনী প্রচলিত আছে।

রাজা হরিশচন্দ্র হযরত শাহ আলী (রহ.)-এর ইসলাম প্রচারে বাধা দিতে থাকলে তিনি তাঁর এক কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এতে রাজা হরিশচন্দ্র তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। এর মধ্যে একদিন রাজা হরিশচন্দ্রের উক্ত কন্যাকে বিষাক্ত সাপে দংশন করে। বহু ওঝা-বৈদ্য, কবিরাজ যখন সাপের বিষ নামাতে পারল না, তখন গত্যন্তর না দেখে অবশেষে তার শেষ কৃত্যের জন্য শশ্মানে নিয়ে যাচিছল। এমন সময় হযরত শাহ আলী (রহ.) সামনে পড়লে তিনি ঘটনা শুনে বললেন, এখন তো তোমরা তাকে পুড়ে ভস্মিভূত করে দেবে। তার চেয়ে মেয়েটাকে আমাকে দিয়ে দাও।

রাজা হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর কথায় রাজী হন। হযরত শাহ আলী (রহ.) কুরআনের আয়াত পড়ে দূর থেকে তার কফিনে ফুঁ দিলেন। এরূপ কয়েকবার ফুঁ দেওয়ার পর মেয়েটি কফিনের ভিতর থেকে ওঠে এল। রাজা হরিশচন্দ্র এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নিজেও ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলেন এবং হযরত শাহ্ আলী (রহ.)-কে কন্যাদান করেন।

রাজা হরিশচন্দ্রের ইসলাম গ্রহনের খবর চারিদিকে ছড়িযে পরলে আরও বিধর্মীরা এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে অল্পকালের মধ্যে ফরিদপুর অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপকতা লাভ হয়। মোটকথা. এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে আর কোন বাধা রইল না।

হযরত শাহ্ আলী (রহ.) কোন এক জাগায় স্থির থাকার মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি তাঁর সঙ্গী-সূফীদের নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকা যোগে ইসলাম প্রচার করেছেন।

 তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য বরিশাল, বাগেরহাট, বোলমান্দিয়া, বরিশালের  দাসের কাঠি সরণদ্বীপ ভ্রমন করেছেন।

বাংলার স্বাধীন সুলতান সামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ্ এর রাজত্বকালে (১৪৭৪-১৪৮১ সাল) এ অঞ্চলের গভর্নর জহির উদ্দীন খান কর্তৃক ৮৮৫হিজরী, ১৪৮০সালে মিরপুরে (বর্তমান ঢাকার মিরপুর-১) একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

কাদেরিয়া তরিকার কামেল অলি হওয়া সত্বেও চিশতীয়া তরিকায় সাধনার জন্য ঢাকায় হযরত শাহ মোহাম্মদ বাহার শাহ (রহ.) এর নিকট তিনি বায়াত গ্রহণ করেন। আপন মোর্শেদের নির্দেশে তিনি ফরিদপুরের গেরদা হতে মিরপুরে (বর্তমান ঢাকার মিরপুর-১) আসেন এবং খানকাহ্ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ধর্ম প্রচার করতে থাকেন।

১৪৯৮ সালে মসজিদে তিনি চল্লিশ দিনের জন্য মোরাকাবা করার উদ্দেশ্যে একটি কক্ষের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করেন এবং তাঁর খাদেমের উদ্দেশ্যে সতর্ক করে দেন যে, পরবর্তী ৪০ দিন মোরাকাবারত অবস্থায় কোন ক্রমেই যেন তাঁকে বিরক্ত করা না হয় । কিন্তু৩৮ তম দিনেই মোরাকাবারত অবস্থায় তিনি ওফাত লাভ করেন এবং এই কক্ষটির মধ্যেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। সেদিন হতে এ মসজিদটি সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (রহ.)-এর মাজার শরীফে পরিণত হয়।

 বাদশাহ নাসিরুল মুলকের আমলে প্রায় ১৮০৭ সালে (হিজরী ১২২১ সালে) মুহম্মদী শাহ নামক অপর এক সুফি ব্যক্তিত্ব উক্ত রওজাকে তৃতীয় বারের মত পূণনির্মাণ করেন।


Post a Comment

0 Comments